প্রথমত ‘মা’ ডাকা হয় শ্রদ্ধা করে বা সম্মান করে। যুগে যুগে মানুষ সম্মান দেখানোর জন্য ‘মা’ শব্দটিকে খুব নিবিড় ভাবে ব্যবহার করেছে। যেমন, দেশকে > দেশ মাতা; রাজার স্ত্রীকে > রাণী মা; নদীবহুল অঞ্চলকে > নদী মাতৃক; বিশেষ গাছকে > মা সীতলা; বিশেষ নদীকে > গঙ্গা মা ইত্যাদি।
এখন কথা হলো, এই গরুকে কেন হিন্দুরা এত শ্রদ্ধা বা সম্মান করে?
অনেক কারণেই এই শ্রদ্ধা বা সম্মান করা হয়। আমি কোনো ধর্মিয় ব্যাখ্যা না দিয়ে কিছু সাধারণ সামাজিক, মনস্তাত্বিক ও সংস্কারের ব্যাখ্যা দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করছি।
আমাদের এই অবিভক্ত ভারত বর্ষে (বর্তমান ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ইত্যাদি) প্রধান জীবিকা হলো কৃষি কাজ। আর যখন বিজ্ঞানের এত অগ্রগতি ছিলো না, তখন হাল চাষের জন্য একমত্র অবলম্বন ছিলো গরু। জমিতে হাল চাষ, ধান মাড়াই, ঘাণিতে তৈল উৎপাদন, কুয়া থেকে পানি উত্তোলন, গরুর গাড়ি দিয়ে যাতায়ত ও পন্য বহন ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় প্রত্যেক কাজে প্রয়োজন হতো গরু। এছাড়াও গরুর দুধ দিয়ে হাজার রকমের খাদ্য বস্তু তৈরি করা যায়। যেমন, দই, মাখন, ঘি, মিষ্টি, সন্দেশ, ইত্যাদি ইত্যাদি। যা ক্রয় বিক্রয় করে একটা পরিবার খুব স্বচ্ছল ভাবে জীবন অতিবাহিত করতে পারে। তাই দেখা যেত, যে গ্রামে বা যে সমাজে গরু নেই, সেই গ্রামে দুর্ভিক্ষ লেগে যেত। তাই তখন যার পরিবারে যত গরু সে তত ধনী হিসেবে গন্য হতো। হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডে গরু ছিল অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। তাই তখনকার সমাজপতিরা গো হত্যা নিষিদ্ধ করেছিল এবং ব্রাহ্মণ সমাজ এটা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে বিষয়টা আরো গাঢ় করে দেওয়া দিয়েছে, যাতে কেউ খাদ্য হিসেবে গো মাংস না খায়, বা গো হত্যা না করে এবং গো হত্যাকে মহা-পাপ হিসেবে উল্লেখ করে মৃত্যুর পর নরকে যাওয়ার বিধান চালু করা হয়।
এছাড়াও আরেকটা বিষয় হলো, আমদের মানব শিশু মাতৃগর্ভে ৯ মাস বা সাড়ে ৯ মাস থাকতে হয়। দেখা যাচ্ছে গরুরও গর্ভকালীন সময় ৯ মাস বা সাড়ে ৯ মাস। তাই গরুর দুধ ও মানুষ-মায়ের দুধের মধ্যে পুষ্টিগুণ প্রায় কাছাকাছি (পার্থক্য নেই বললেই চলে), পৃথিবীতে অন্য কোনো প্রাণীর দুধ মানুষে-মায়ের দুধের সমতুল্য নয়। তাইতো কোনো মানব শিশুর জন্মের সময় যদি তার মায়ের মৃত্যু হয়, তাহলে গরুর দুধ মায়ের দুধের বিকল্প হিসেবে ঐ মানব-শিশুকে পান করানো যায়। তাহলে ঐ গরুকে মা ঢাকা যাবে না কেন? ইসলাম ধর্মেও আছে, যদি কোনো শিশুর জন্মের সময় মা মারা যায় তবে অন্য কোনো দুগ্ধবতী মহিলা যদি ঐ শিশুকে দুধ পান করায়, তখন তাকে ‘দুধ মা’ বলা হয়। তাহলে যদি গরুর দুধ পান করে কোনো মা’হীন শিশুর জীবন বেঁচে যায়, তাহলে গরুকে কেন ‘দুধ মা’ বলা যাবে না? অথবা অন্তত পক্ষে সম্মান করে কেন ‘গো-মাতা’ বলা যাবে না? যেখানে এই সমাজে গরুর ভুমিকা মাতৃতুল্য।
শুধু যার পেট থেকে আমি পৃথিবীতে আসলাম সেই মা নয়। জন্মদাত্রী মায়ের অবর্তমানে যে আমাকে দুধ খাইয়েছেন, সেও মা সম। জন্মদাত্রী মায়ের অবর্তমানে যে আমাকে লালন-পালন করেছেন সেও মা সম। সমাজে দেখা যায়, অনেক বড় বোন, মায়ের ভূমিকা পালন করে। তখন গর্ভে না ধরেও ঐ নারী মায়ের মর্যাদায় বসে যান। একইভাবে যুগে যুগে গরুর অবদানের কারণে গরু মায়ের মর্যাদা অর্জন করে নিয়েছে।
আধুনিক সমাজে চাষের জন্য ট্রাক্টর আছে, দুধের বিকল্প নকল দুধপাউডার আছে, যাতায়তের জন্য গাড়ি আছে, তৈল উৎপাদনের জন্য মেশিন আছে, মাতৃহীন নবজাতক শিশুর জন্য বাজারে হাজারও কেমিকেলের দুধ আছে, তাই আমাদের কাছে এখন গরুকে মূল্যহীন মনে হয়। মা’য়ের সাথে তুলনা করলে হাসি পায়। কিন্তু বিষয়টা আজকের আধুনিকতার সাথে তুলনা না করে, হাজার বছর অতীতের দিনগুলোর সাথে তুলনা করলে গরুর প্রতি কৃতজ্ঞ চলে আসে।
এই দেশে আমরা জন্মেছি, এই দেশের আলো-বাতাসে আমরা বড় হয়েছি; তাইতো দেশকে আমরা ‘দেশ মাতৃকা’ বলি। গরুর বেলায় কেন এত ছোট মানসিকতা।
আমি গরুর মাংস না খাওয়ার জন্য বারণ করছি না। অবশ্যই আপনি গুরুর মাংস খাবেন বা আপনি নিয়মিত গো-মাংস খান কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু কেউ যদি কৃতজ্ঞতা দেখিয়ে গরুকে ‘মা’ এর সাথে তুলনা করে তবে বিষয়টা হাসির নয়, বিষয়টা কৃতজ্ঞতার।
তবে ভারতে বা বিভিন্ন স্থানে গো মুত্র খাওয়ার, বা অন্য শ্রেণির উটের মুত্র খাওয়া বিষয়টা বাড়াবাড়ি। এর সাথে সামাজিক রীতি বা সংস্কারের কোনো সম্পর্ক নাই। যারা এসব করে, হয় তাদের জ্ঞান নাই, অথবা অতি ভক্তি দেখাতে গিয়ে এমন করে।